সিকিম – উৎসব, যাপন ও রঙ

sikkim FESTIVAL

1,206 total views, 4 views today

কলকাতা নিয়ে কোনো ছবি বা কথাই দূর্গা পুজো কে বাদ দিয়ে সম্পূর্ণ হয়না।  তার কারন উৎসব হলো কোনো একটা স্থানের মূল ঐতিহ্যের উদাহরণ। তার গৌরব। তার অলঙ্কার।  তার পরিচয়।

ঠিক যেমন গুজরাটের নবরাত্রি গড়বা , পাঞ্জাবের বৈশাখী বা লোরি, উত্তরপ্রদেশের লাঠমার হোলি, দক্ষিণের পোঙ্গল ও ওনাম, আসামের বিহু , ওড়িশার রথ , বিহারের ছট পূজা – প্রতিটা জায়গার জীবন, ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে আমাদের মুখোমুখি করায়।

নির্দ্বিধায় আমরা নেচে উঠি ভাংড়ার তালে।  হয়তো সেটা আমাদের ভাসান নাচ , হয়তো গড়বার লাঠি আমরা ধরি ঢাকের কাঠি ধরার মতই।  তাতেই বা ক্ষতি কি বলুন?

ভারত উৎসবের দেশ।  বৈচিত্রের দেশ।  যেখানে ধর্ম , বিশ্বাস ও ঐতিহ্য রূপ নেয় এক নতুন উৎসবের আর যা মিলে মিশে যায় যাপনে। যেখানে প্রতি কিলোমিটারে বদলে যায় উৎসবের সুর , নাম ও রঙ।

সিকিম – নেপাল, ভুটান, বাংলা ও তিব্বতের সীমায় অবস্থিত হওয়ায় এখানকার উৎসবে মিশেছে নানা সুর।  হিসেব মত দেখলে সিকিমে উৎসবের সংখ্যা ৩০ এর বেশি কিন্তু আপাতত এখানে দেওয়া হল আসন্ন উৎসবের তথ্য :

SikkimFestivals

লসঃঙ্গ উৎসব (Losoong Festival)- ১০ ডিসেম্বর

ফসল কাটা ও নতুন বছর কে স্বাগত জানানোর উৎসব এটি।  তিব্বতীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ম মাসের ১৮ তম দিনে এই উদযাপন আরম্ভ হয়, যা আসলে এই বছর  ১০ ই ডিসেম্বর।

অনেকেই মনে করেন এই উৎসব চাষীদের সারা বছর কঠোর পরিশ্রম করার উৎসাহ প্রদান করে ..

চাম নাচ ও তীরন্দাজি প্রতিযোগিতা ছাড়াও অসুর দহন, লোকগীতি , সিকিমের নানা খাবার ও যত্নে সাজানো সব বাড়ি হলো এই উৎসবের আকর্ষণ  । চাম নাচের বৈশিষ্ট হল, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর এই নাচ নাচেন এবং এই নাচ দেখা মাত্রই পুন্য লাভ হয় বলে বিশ্বাস। এই উৎসবের খ্যাতি ভারতীয় সীমারেখার উর্দ্ধে।

ইন্দ্র যাত্রা (Indra Yatra)- ২৩এ সেপ্টেম্বর

কথিত আছে দেবরাজ ইন্দ্র একবার কাঠমান্ডুতে, বিনা অনুমতিতে পারিজাত ফুল তুলতে গিয়ে ধরা পড়েন ও বন্দি হন।  বন্ধ হয়ে যায় বৃষ্টি।  যখন তাঁর প্ৰকৃত পরিচয় জানা যায় তখন তাঁকে প্রসন্ন করতে শুরু হয় ইন্দ্র যাত্রা উৎসব। সিকিমের ‘নেওয়ার’ নেপালি গোষ্ঠীর উৎসব হলেও ইন্দ্র যাত্রা পুরো সিকিম জুড়েই পালিত হয়।

বিশাল রথ, নানান বাদ্য আর তার সাথে রঙিন মুখোশ পরে নাচ এই উৎসব পালনের মূল অঙ্গ।  ইন্দ্র যাত্রার আরেক অভিন্ন অঙ্গ হল ‘কুমারী যাত্রা’। এই উৎসব ৮ দিন ধরে সিকিমকে মোহিত করে রাখে।

ভারতীয় পুরান যে ভারতবর্ষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে উৎসব হয়ে, আচার হয়ে , জীবন যাত্রা হয়ে সদা জাগ্রত তার প্রমান এই উৎসব। এই উৎসব গুলোই ভারতের বৈচিত্রময় জাতি গুলিকে তাদের নিজস্বতা সমেত একটা মালায় গেথে রেখেছে।

উৎসব চলাকালীন কোথায় থাকবেন ভাবছেন, ক্লিক করুন..

লসার (Losar) – ৫ই ফেব্রূয়ারি

সিকিম ছাড়াও লসার উদযাপিত হয় লাদাখ, অরুণাচলের মত স্থানেও। ১৫০০ শতাব্দীতে শুরু এই উৎসব তিব্বতীয় নববর্ষের উদযাপন।  ঘর থেকে দূরে থাকা সকলে এই উৎসবে ঘরে ফিরে আসে।  এই উৎসবেরও কেন্দ্রবিন্দু চাম নাচ।  সারাবছর চাষ ভালো যাতে হয় তার জন্যে বিশেষ কিছু রীতি ও আচার পালন করা হয় এই উৎসবে।

নতুন জামা-কাপড় কেনা থেকে সারা শহর কে সাজানো , পুরো সিকিমে যেন রামধনু নেমে আসে এই সময়।  আরেক আকর্ষণ হলো রাস্তায় ইয়াক নিয়ে নাচ।  এই আপাত দেখতে বিশাল পশু গুলি আসলে কিন্তু নিরীহ।  আর তাদের কে সাজালে মনে হয় উৎসব তাদের ছাড়া অসম্পূর্ণই থেকে যেত।

দাসিন (Dassain)- ১৯ অক্টোবর

স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী বদলে যেতে থাকে উৎসব ও তার নাম।  তাই আপনার-আমার দূর্গা পূজা সিকিমের ‘দাসিন’।  মূলত অক্টোবর এই পালিত হয় এই উৎসব এবং উদযাপিত হয় ১৫ দিন ধরে , নিয়ম ও আচার অনেকটাই নবরাত্রির মত। সিকিমের নেপালি হিন্দুরা এই উৎসবের হোতা। ১০ম দিন বিজয়া দশমী।

দূর্গা পূজার সাথে সিকিমের জীবন শৈলীর মেল্ এই উৎসব দেখার মত। প্রথম দিনে একটি পাত্রে ভুট্টা বা বার্লির বীজরোপন দিয়ে যে উৎসব শুরু হয় তা শেষ হয় ১০ দিন পর পরিবারের ছোট সদস্যের হাতে চারা টি ধরানো দিয়ে।  ভারতীয় সংস্কৃতির মাহাত্ম এখানেই। একটি সাধারণ নিয়মে লুকোনো একটি অসাধারন বার্তা। ভবিষ্যতের চাবি তুলে দেওয়া নতুনের হাতে , প্রকৃতিকে সবুজ রাখার অনুপ্রেরণা তুলে দেওয়া আগামীর হাতে।

এই সংস্কৃতিই তো আধার এই যুগ প্রাচীন সভ্যতার।  ভোল্গা থেকে গঙ্গার জলের চলাচলের সাক্ষী এই সব উৎসবই তো !

তিহার (Tihar) – ৭ই নভেম্বর

যতগুলো সিকিমের উৎসব সম্বন্ধে জানা আছে তাদের মধ্যে আমি ব্যক্তিগত পছন্দ করি তিহার।  এই বছর এটি শুরু হচ্ছে ৭ই নভেম্বর।  ৫ দিন ব্যাপী এই উৎসবে পূজিত হয় আমাদের চারপাশের অবলা পশুরা।  তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর উৎসব এটি।

প্রথম দিন ‘কাকের’ পুজো দিয়ে সূত্রপাত। তার পর কুকুর, মোষ , গরু পূজিত হয়।  যদিও শেষ দিনটি আমাদের ভাই ফোঁটারি নামান্তর।

প্রতিবেশী বাড়িতে গিয়ে ভাইলো (মেয়েদের উদ্দেশ্যে ) ও দেউসি রে (ছেলেদের উদ্দেশ্যে ) গান গাওয়াও এই উৎসবের অঙ্গ।

এই উৎসব আলোর উৎসব। হয়তো অন্তরের মানিবকতার আলোর প্রতিভূ এই উৎসব। হয়তো এখনো ধংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্যোগ এই উৎসব।

এঞ্চে চাম (Enchey Chaam)- ডিসেম্বর

সিকিমের মানুষ সাধারন। সাধারণ তাদের আনন্দ তাই তা অনাবিলও । তাদের জীবনের একটি নির্দিষ্ট ছন্দ আছে, হয়তো সেই জন্যেই তারা জীবন কে নাচের মধ্যে, উৎসবের মধ্যে খুঁজে পায়।  তাই তারা এতটা প্রাণবন্ত। এসব রঙিন উৎসব গুলোরই একটা হল এঞ্চে চাম।

এঞ্চে এখানকার ধর্মীয় গোষ্ঠী , সেই গোষ্ঠীর লামারা যখন তাদের ঐতিহ্যের চাম নাচ নাচে, শুধু দেখারই নয় , তা শেখারও। দেব আরাধনা যে শুধুই অঞ্জলি, পূজা বা যে কোনো একটি নিয়মাবদ্ধ নয়, তা এই ভক্তিসিক্ত নাচ দেখলেই বোঝা সম্ভব একমাত্র। ।  যেমন বিচিত্র ভারতের মানুষ তেমনি দেবতার প্রসন্নতা। এবং কি বলুন তো, ভক্তির আর ভালোবাসার কোনো সঠিক বা বেঠিক বলে কিছু হয়না।

যেকোনো জায়গার আসল চেহারা দেখতে হলে মাটির কাছাকাছি থাকতে হয়।  ভাগ্যিস হোমস্টে ছিল।  না হলে কোনোদিন দেখাই হতোনা উনুনের আঁচ কিভাবে পাহাড়ের বুকের কাছে মেঘ হয়ে যায় , উঠোনে ঝাড় দিতে গিয়ে মেয়েটা তার প্রথম প্রেমের গান কোন সুরে গায়।  সময় মত চা , স্নানের গরম জলের উর্ধে গিয়ে দেখুন আসল বেড়ানো কাকে বলে।  উৎসব অন্দরে ঢুকলে দেওয়ালে আলপনা কিভাবে দিয়ে যায়।  সিকিমের ছোট কোনো ঘরের মেঝেতে বসে একসাথে ভাগ করে তাঁদের পরবের খাবার উপভোগ করে বুঝবেন, কাঁটা-চামচ সরিয়ে রেখে হাতে খাবার মজাই আলাদা।

কিছু কাছাকাছি হোমস্টের খোঁজ দেওয়া হোলো ..

যদি সিকিমের সমস্ত উৎসব কে ধরতে হয় তাহলে আপনাকে গোটা ৮-১০ বার সিকিম যেতে হবে।  আমরা মাঝে মাঝেই ভ্রমণপিপাষু শব্দ ব্যবহার করি কিন্তু এর প্ৰকৃত অর্থ ও উপলব্ধি থেকে আমরা অনেকটা দূরে।  জন্ম থেকে সবচেয়ে বেশিবার যাওয়া পুরি বা দার্জিলিং এর জীবন, আনন্দ, উদযাপনই বা কত টুকু জানতে পেরেছি আমরা?

যে সিকিমের কথা কম লোকেই জানে, যে সিকিম এখানকার পাহাড়ি সুরে, অনাড়ম্বর রান্নাঘরে ও প্রার্থনায় পতাকায় বিরাজ করে সেই সিকিম হল এই উৎসবের সিকিম। গুমফার প্রাঙ্গনে চাম নাচের তালে হিমালয় এখানে জেগে ওঠে। তাইতো কাঞ্চঞ্জঙ্ঘাও এখানে উৎসবের অঙ্গ। তাইতো সিকিমের সবুজ সদা অম্লান।

BookyourHomestayBanner

Cab Services

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *